ভয়েস অব সিলেট নিউজ:
পিলখানা হত্যা মামলার সাক্ষ্য ও জেরায় মরক্কোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও পুলিশের সাবেক আইজি নুর মোহাম্মদ বলেছেন, ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইন প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ ছিল লোকদেখানো। শুধুমাত্র তিন-চারটা অস্ত্র সমর্পণ করেছিল তারা। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়েছিল দাবি না মানা পর্যন্ত তারা আত্মসমর্পণ করবে না। সাবেক আইজিপি বলেন, ওই সময় পিলখানায় কারও কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কারও কোন নেতৃত্ব ছিল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার ধৈর্যও তাদের ছিল না। তারা যে যেভাবে পারছে কথা বলেছে। তাতে বোঝা গেল- তারা সারেন্ডার করবে না। রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি আলীয়া মাদরাসা সংলগ্ন মাঠে পিলখানা হত্যাযজ্ঞ মামলার বিচারে নির্মিত ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে সাক্ষ্য দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন সাবেক এই আইজিপি। এর আগে সকাল পৌনে ১০টায় আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপরই সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মদ পিলখানা হত্যাযজ্ঞ মামলার ৩১৬ নম্বর সাক্ষী হিসেবে আদালতে তার জবানবন্দি উপস্থাপন করেন। পরে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট আমিনুল ইসলাম। তার জেরার জবাব দিতে গিয়ে নুর মোহাম্মদ আদালতকে জানান, পুলিশ বাহিনীর প্রধান হিসেবে পিলখানায় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে পিলখানার চারপাশে যে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল সেটাও ছিল লোকদেখানো- আইনজীবীর এ প্রশ্নের জবাবে সাবেক আইজিপি বলেন, সত্য নয়। তিনি অসহায়ের মতো দায়িত্ব পালন করেছেন এবং যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন- আইনজীবী আমিনুল ইসলামের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সত্য নয়। তিনি তার দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে বহিরাগতরা পিলখানায় ঢুকে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করেছে- নুর মোহাম্মদ বলেন, সত্য নয়। আইনজীবী আমিনুল ইসলাম জেরার শুরুতেই জানতে চান- বিদ্রোহের খবর পাওয়ার পর কখন আপনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন? জবাবে সাবেক আইজিপি বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই কথা বলি সকাল সাড়ে ৯টায়। দ্বিতীয় দফায় কথা হয় সকাল সোয়া ১০টার দিকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে কথা বলছিলেন- আপনাকে এটা জানিয়েছিলেন? না। তবে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরই অংশ হিসেবে পিলখানার চারপাশে প্রচুর সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। সংখ্যা কত ছিল? এটা এখন বলা সম্ভব নয়। পুলিশ সদস্যরা কি কাউকে আটক করেছিল? আমার জানামতে করেনি। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘যমুনা’য় যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার কথা হয়েছিল? না। পিলখানায় গোলাগুলি হচ্ছে- এমন খবর পাওয়ার পর মেয়ে ও বিডিআর-এ কর্মরত মেয়ে জামাইর খোঁজ নিয়েছিলেন? জি। মোবাইলে ফোন করেছিলাম। মেয়ের জামাই আপনার কাছে কোন সহায়তা চেয়েছিল? পরিস্থিতি জানিয়েছিল। বলেছিল, জওয়ানরা ডিজি স্যারকে গুলি করতে চেয়েছিল। এ তথ্য দেয়া ছাড়া কোন সহায়তা চায়নি। তখন পর্যন্ত ডিজি শাকিল বেঁচেছিলেন- এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন? জি। ডিজি শাকিলের সঙ্গে আপনার কোন কথা হয়েছিল? না। মেয়ে জামাইর সঙ্গে সারা দিনই কি আপনার কথা হয়েছিল? দু’বার কথা হয়েছিল। তবে মেয়ের সঙ্গে দিনে ও রাতের বিভিন্ন সময় কথা হয়েছিল। সে বলেছিল, বাবা চারদিকে গোলাগুলি হচ্ছে। ভয়ভীতির মধ্যে আছি। তবে ভিতরের হত্যাকাণ্ডের তথ্য তখন তারা দিতে পারেনি। ‘যমুনা’য় গিয়ে কি তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে দেখা হয়েছিল? জি। তবে ‘যমুনা’য় বেশিক্ষণ ছিলাম না। ডিজি র্যাবকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পিলখানায় যাই। নিউ মার্কেট এলাকায় দু’জন সেনা কর্মকর্তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা শুনেছিলেন? শুনেছি। তবে ‘যমুনা’য় যাওয়ার আগে না পরে শুনেছিলাম মনে নেই। সুয়্যারেজ লাইন থেকে দুই সেনা সদস্যের লাশ উদ্ধারের কথা শুনেছিলেন? ‘যমুনা’য় যাওয়ার আগে শুনেছিলাম। ‘যমুনা’য় কি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার কথা বা বৈঠক হয়েছিল? না। বিদ্রোহ দমনে ব্যক্তিগতভাবে কোন উদ্যোগ নিয়েছিলেন? না। প্রধানমন্ত্রী যখন বিষয়টি দেখছিলেন তখন ব্যক্তিগতভাবে কোন পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ ছিল না, করিনি। পিলখানার আশপাশের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়েছিল, কার নির্দেশে কে এই মাইকিং করেছিল? মাইকিং হয়েছিল। তবে কার নির্দেশে মাইকিং হয়েছিল তা জানি না। যিনি মাইকিং করেছিলেন তার সম্পর্কেও কিছু জানি না। বহিরাগতদের পিলখানায় ঢোকার সুযোগ দিতেই আশপাশের বাসিন্দাদের সরে যেতে বলা হয়েছিল? সত্য নয়। ২৫শে ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে পিলখানার অভ্যন্তরে কোন ‘ডেড বডি’ দেখেছিলেন? না দেখিনি। তার মানে ওই রাতে পিলখানায় কোন হত্যাকাণ্ড ঘটেনি? সত্য নয়। মাইকিংয়ের পর ২৬শে ফেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়? সত্য নয়। ‘যমুনা’য় যাওয়া ১২-১৪ জনে দলের সদস্যদের সঙ্গে পূর্বে আপনার পরিচয় ছিল? জি না। তাদের সঙ্গে আপনার ‘যমুনা’য় কোন কথা বা বৈঠক হয়েছিল? না। পিলখানার অভ্যন্তরে যারা আপনাদের গাইড করে নিয়ে গেছে, উত্তেজিতভাবে বক্তৃতা করেছে তাদের কোন তালিকা রেখেছিলেন? না। তালিকার করার মতো পরিস্থিতি সেখানে ছিল না। মেয়ে জামাই নিহত হওয়ার কারণে আপনি সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। এ কারণে আপনাকে আইজিপি পদ থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রদূত করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে? সঠিক নয়।
এ পর্যায়ে সাবেক আইজিপিকে আসামি ডিএডি আবদুল জলিলের পক্ষে জেরা করেন এডভোকেট শামীম সরদার। এই আইনজীবী দাবি করেন, ঘটনার দিন পিলখানার চারপাশে সেনা সদস্যরা অবস্থান নিয়েছিল। জবাবে নূর মোহাম্মদ বলেন, আমি দেখিনি। চারপাশে পুলিশ ছিল। সেনা সদস্যরা সামরিক অবস্থান নিয়েছিল জানেন? শুনেছি। দেখিনি। বিদ্রোহ দমনে কেউ কোথাও গেলে তো খালি হাতে যাবে না। বিমানবাহিনীর ৪-৫টা হেলিকপ্টার ওইদিন পিলখানায় সামরিক অভিযান চালায়? সত্য নয়। প্যারেড গ্রাউন্ডে কতজন সৈনিকের সঙ্গে কথা হয়? কয়েকজনের সঙ্গে। তবে সেখানে আরও কয়েক শ’ সৈনিক উপস্থিত ছিল। আপনার মেয়ে জামাই ক্যাপ্টেন মাজহার দরবার হলে সৈনিকদের উপর প্রথম গুলি ছোড়ে? সত্য নয়।
শামীম সরদারের জেরা শেষে সিপাহি সেলিম রেজার পক্ষে জেরা করেন এডভোকেট ফারুক আহমদ। ২৫শে ফেব্রুয়ারি রাতে পিলখানায় যাওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গাড়িতে কে কে ছিলেন? জবাবে সাবেক আইজিপি বলেন, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন প্রতিমন্ত্রী ও আমি। আইনজীবী দাবি করেন- ওই গাড়িতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গানম্যান ও তার ভাগ্নে সরোয়ারও ছিল? জবাবে তিনি বলেন, সঠিক। ভাগ্নে সরোয়ার কোন সরকারি দায়িত্বে ছিলেন না? সাবেক আইজিপি বলেন, সঠিক। অস্ত্র সমর্পণের সময় পিলখানার অভ্যন্তরে বিটিভির ক্যামেরা ছিল? খেয়াল নেই। তবে অস্ত্র সমর্পণ বলতে যা বোঝায় তা হয়নি। তিন-চারটা অস্ত্র জমা দেয়ার ঘটনা ঘটে। এ প্রশ্নে পরে আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নুর মোহাম্মদ বলেন, ২৫শে ফেব্রুয়ারি রাতে পিলখানায় সৈনিকদের আত্মসমর্পণ ছিল লোকদেখানো। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বিডিআর সদস্যদের আত্মসমর্পণ করানোর উদ্দেশ্যেই পিলখানায় গিয়েছিলাম। আইনজীবী ফারুক আহমেদ তার কাছে জানতে চান, প্রধানমন্ত্রী বিদ্রোহীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন? জবাবে তিনি বলেন, খেয়াল নেই। আইনজীবী দাবি করেন, ২৬শে ফেব্রুয়ারি জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) থেকে শিডিউলের বাইরে বিমান উড়েছিল। এই বিমানে করে কিলাররা দেশের বাইরে চলে যায়? সত্য নয়। আইনজীবীদের সহায়তা করেন এডভোকেট জামাল উদ্দিন খন্দকার, মোহাম্মদ রমজান খান, শামীমা আক্তার রুবি। জবানবন্দিতে যা বলেন সাবেক আইজিপি: জবানবন্দিতে সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মদ আদালতকে জানান, ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি অফিসে কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) হাসান মাহমুদ খন্দকার টেলিফোনে তাকে জানান, পিলখানায় গোলাগুলি হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমি তাৎক্ষণিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তখন তিনি বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ডিএমপির কমিশনারসহ সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ও পরবর্তী পরিস্থিতি জানাতে নির্দেশ দেন। পুলিশ ও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, পিলখানায় প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছে। আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে ডিএমপি কমিশনার নাঈম আহমেদ, ডিজি র্যাব, ডিআইজি এপিবিএন পুলিশ সদর দফতরে পৌঁছেন। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ফোর্স মোতায়েনের জন্য নির্দেশ দেন। তারা নির্দেশনা অনুযায়ী পিলখানার চারপাশে ফোর্স মোতায়েন করেন। এ পরিস্থিতিতে কি ব্যবস্থা নেয়া যায়, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করি। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে জানান, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি সরাসরি খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং পরে কি ব্যবস্থা নেয়া যায় সেজন্য তিন বাহিনীর প্রধানসহ অন্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে তিনি জানতে পারেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গির কবির নানক ও হুইপ মির্জা আজমসহ আরও কয়েকজন বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের জন্য যোগাযোগ করছেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডিজি র্যাব, ডিএমপি কমিশনার ও অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে আইজিপি শাহবাগের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে যান। কন্ট্রোলরুমে ডিজি র্যাব, ডিএমপি কমিশনার ও অন্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পিলখানার চলমান ঘটনাটি তিনি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। সেখান থেকেই তিনি ঘটনার প্রয়োজনীয় মনিটরিং ও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিতে থাকেন। বিকাল ৪টার দিকে ডিজি র্যাবসহ আইজিপি মৌখিক নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘যমুনা’য় যান। এ সময় বিডিআর সদস্যরা আলোচনা করতে রাজি হওয়ায় জাহাঙ্গির কবির নানক ও মির্জা আজম ১২-১৪ জনের একটি দল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে যান। ওই দলে ডিএডি তৌহিদ, ডিএডি নাসির, ডিএডি জলিল, ডিএডি রহিম, সিপাহি সেলিম রেজা ও সিপাহি মনিরসহ আরও কয়েকজন ছিল। এরপর সন্ধ্যার দিকে তিনি পিলখানার চার নম্বর গেটের নিকটবর্তী হোটেল আম্বালা ইনের সামনে অবস্থান করে অন্যান্য বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। রাত ১২টার দিকে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করতে আগ্রহী হয়। তারপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি রাত আনুমানিক ১টার দিকে পিলখানার ভিতরে যান। বিডিআর সদস্যরা গাইড করে তাদের ভিতরে প্যারেড গ্রাউন্ডের গ্যালারির কাছে নিয়ে যায়। তখন তাদের আটক অফিসার ও লোকজনের কাছে নিয়ে যেতে বলা হয়। এ সময় পাঁচ-সাত জন জওয়ান বক্তৃতা দিয়ে তাদের দাবি আদায়ের কথা বলে। দাবি আদায়ের আগে সারেন্ডার করবে না বলেও জানিয়ে দেয় তারা। এ সময় স্বরাষ্টমন্ত্রী ও আইন প্রতিমন্ত্রী বক্তৃতা দিয়ে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। তারা নানারকম টালবাহানা করে সময় নষ্ট করছিল। তারা মূল ঘটনাস্থল দরবার হল ও আটক অফিসার এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা কোথায় আছে সেখানে তাদের দেখানো হয়নি। তারা সকলেই সশস্ত্র অবস্থায় থাকায় এবং অবস্থা গুরুতর মনে হওয়ায় তাদের ওপর চাপ প্রয়োগও সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন ভাবে তাদের বোঝানোর পর এক পর্যায়ে তাদের কোতের সামনে নিয়ে সেখানে কিছু অস্ত্র জমা দেয়। কিন্তু কোয়ার্টার গার্ডের ভেতরে তাদের নিয়ে যায়নি তারা। সেখান থেকে তাদের বিভিন্ন বাসা ও কোয়ার্টারে নিয়ে যায় তারা। তখন ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাটের লোকজনকে ভীত সন্ত্রস্ত দেখা যায়। যতটুকু সম্ভব বাসার লোকজনদের বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করি। তিনি বলেন, তার মেয়ের জামাই ক্যাপ্টেন মাজহার ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের এডিসি’র দায়িত্বে ছিল। তখন মেয়ের খবর নেয়ার জন্য অফিসার্স মেসে যাই। সেখানে অবস্থান করার সময়ে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম অন্যদের সঙ্গে তার মেয়েকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে ভোর ৪টার দিকে তারা পিলখানা থেকে বের হন। ওই সময় মেয়ে জামাই মাজহারের কোন সন্ধান করতে পারিনি। পরে আমার মেয়ে জামাইয়ের লাশ লালবাগ থানার নবাবগঞ্জ পার্কের স্যুয়ারেজ লাইন থেকে উদ্ধার করা হয়। বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা অন্য সেনা অফিসারদের সঙ্গে তাকেও হত্যা করে।
সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মদকে জেরা শেষে আদালতে সাক্ষ্য দেন সেনা কর্মকর্তাদের লাশের ডিএনএ পরীক্ষাকারী ও ন্যাশনাল ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডাক্তার অধ্যাপক শরীফ আখতারুজ্জামান। তাকে সহায়তাকারী ডা. ইউনুছ আলী ও ডা. আহমেদ ফেরদৌস ও আসামিদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট শামীমা পারভিন। বর্তমানে তিনি মুন্সীগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পরে বিচারক জহুরুল হক আগামীকাল পর্যন্ত এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের কার্যক্রম মুলতবি করেন।
গত বছরের ২৪শে আগস্ট পিলখানা হত্যা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষ্য দেন মামলার বাদী লালবাগ থানার সাবেক ওসি নবজ্যোতি খিসা। দ্বিতীয় সাক্ষ্য দেন নিউ মার্কেট থানার সাবেক ওসি কামাল উদ্দিন। এরপরই প্রত্যক্ষদর্শী সেনাকর্মকর্তা ও বিজিবি সদস্যদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এ মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের ৫ই জানুয়ারি। বিদ্রোহের সময় বেঁচে যাওয়া বিজিবির কর্মকর্তা, নিহতের স্ত্রী-ছেলে মেয়ে ও বিডিআরের ১৮২ সদস্য ছাড়াও মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশের মহাপরিদর্শক, সাংবাদিক, সেনা কর্মকর্তাসহ এক হাজার ২৮৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এ মামলায় বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু, বিএনপি নেত্রী সুরাইয়া বেগম ও আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ২২ জন বেসামরিক ব্যক্তি রয়েছেন। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের হাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।